আমাদের আয়করের টাকা কোথায় যাচ্ছে?

//আমাদের আয়করের টাকা কোথায় যাচ্ছে?

আমাদের আয়করের টাকা কোথায় যাচ্ছে?

 

আমাদের আয়করের টাকা কোথায় যাচ্ছে?

২০১৭-১৮ অর্থ বছরের বাজেটের আকার হলো ৪ লাখ ২৬৬ কোটি টাকা। এর মধ্যে রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ২ লাখ ৮৭ হাজার ৯৯০ কোটি টাকা।বুঝতেই পারছেন অংকটা বিশাল। 

কিন্তু প্রশ্ন হলো এতো টাকা কোথায় খরচ হবে? কি কাজে এই টাকা ব্যয় হবে? দেশের কল্যাণে কতটুকু ব্যয় হবে?

প্রথম কথা হলো সরকারের নিজস্ব কোন আয় নেই। সরকার জনগণের কাছ থেকে কর আদায় করে সেই টাকা দিয়ে দেশ চালায়।

বাজেটকে কয়েকটি খাতে ভাগ করে বরাদ্ধ দেয়া হয়। তার মধ্যে থেকে আমরা নিচে গুরুত্বপূর্ণ কিছু খাত নিয়ে কথা বলবো যে খাতে সরকার জনগণের দেয়া অর্থ ব্যয় করে থাকে।

এ বছর কোন খাতে সরকার কতো খরচ করবে চলুন এবার একে একে তা জেনে নেই ।

শিক্ষা এবং প্রযুক্তি

একটি জাতির উন্নয়নের প্রথম শর্ত হলো শিক্ষীত নাগরিক গড়ে তোলা। তাই প্রতিটি দেশের সরকারই এই খাতে বিপুল পরিমান বরাদ্ধ রেখে থাকে। আমাদের দেশের সরকারও তাই করে যাচ্ছে। আমাদের বাজেটের সবচেয়ে বেশি বরাদ্ধ পেয়ে থাকে শিক্ষা এবং প্রযুক্তি খাত।

গত বারের চেয়ে এবার এই খাতে ৩০% বরাদ্ধ বৃদ্ধি পেয়েছে। প্রাথমিক শিক্ষা উন্নয়ন এবং মাধ্যমিক শিক্ষার গুণগত উন্নয়ন যার মধ্যে রয়েছে প্রাথমিক বিদ্যালয় জাতীয়করন, কম্পিউটার ল্যাব প্রতিষ্ঠা এবং মাল্টিমিডিয়া ক্লাসরুম তৈরি করা। এ লক্ষে দুইশো উপজেলায় কারিগরি স্কুল প্রতিষ্ঠা করার চিন্তা রয়েছে সরকারের।

জনপ্রশাসন

তবে বাজেটে সবচেয়ে বেশি খরচ হয় সরকারি কর্মচারী-কর্মকর্তাদের মাসিক বেতন এবং আনুষঙ্গিক সুযোগ-সুবিধা বাবদ। বাজেটের তিন ভাগের এক ভাগই চলে যায় তাদের পেছনে।

আপনি হয়তো শুনে থাকবেন, বাজেটে উন্নয়ন এবং অনুন্নয়ন এই দুই খাতে বরাদ্ধ থাকে। বেতন বাবদই অর্থাৎ অনুন্নয়ন খাতেই চলে যাচ্ছে বাজেটের বিরাট একটি অংশ। তাই দেখবেন প্রতি বছর বাজেট পাশের পর এটা নিয়ে দেশের অর্থনীতি বিশ্লেশকরা সমালোচনা করে থাকেন।

২০১৩ সালে এই খাতে বাজেটের মোট বরাদ্ধ ছিলো ২০.৬% যা ২০১৭ সালে বেড়ে দাড়িয়েছে ২৫.৭%।

পরিবহন এবং যোগাযোগ ব্যবস্থা

একটা দেশের ব্যবসা-বাণিজ্য নিরবচ্ছিন্নভাবে পরিচালনার জন্য উন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থার বিকল্প নেই। সরকার যোগাযোগ ব্যবস্থা ভালো করার জন্য অনেক বড় কয়েকটি প্রকল্প হাতে নিয়েছে। এবং এর কাজ দ্রুত এগিয়ে চলেছে। যদি সময়মত শেষ হয় তাহলে এর সুফল পেতে মানুষের বেশি দেরি হবে না।

পদ্মা সেতু রেল সংযোগ, পদ্মা বহুমূখী সেতু, ঢাকা গণপরিবহন ব্যবস্থার উন্নয়ন, দুহাজারা-কক্সবাজার রেল লাইন স্থাপন ইত্যাদি। এই বছর এই খাতে বাজেটের ১২.৫% বরাদ্ধ রয়েছে যা গত বছর ছিলো ১১.৪%।

ঋণের সুদ

সব সময় করের টাকায় দেশ চালানো সম্ভব হয় না। ব্যয়ের থেকে আয় কম থাকে। ঘাটতি দেখা যায়। স্বাধীনতার পর প্রতি বছরই ঘাটতি নিয়ে বাজেট পেশ হয়েছে। সেই ঘাটতি পূরণ করতে সরকার দেশি-বিদেশি বিভিন্ন ঋণদাতা সংস্থার কাছ থেকে ঋণ নিয়ে থাকে। এই ঋণের সুদ পরিশোধ করতেও বাজেটের বেশ একটা ভালো অংশ চলে যায়।

আয়ের থেকে ব্যয় বেশি থাকার কারনেই প্রতি বছর বিশাল পরিমান ঋণ নিতে হয়। এই ঋণের কিস্তি এবং সুদ পরিশোধ করতে এবছর বরাদ্ধ রাখা হয়েছে ১০.৪% যা গত বছর ছিল ১১.১%।

তবে দেশে সরকারের আয়ের পরিমান প্রতি বছরই বাড়ছে। বিভিন্ন খাত থেকে সরকার ভালো রেভিনিউ পাচ্ছেন। এর মধ্যে বড় খাত হলো টেলিযোগাযোগ খাত। সরকার এই খাত থেকে বাজেটের একটি বিশাল অংশ প্রতি বছর পাচ্ছে। এর ফলে সরকারের সক্ষমতা বাড়ছে। ঋণের উপর নির্ভরশীলতা ক্রমান্নয়ে কমছে।

প্রতিরক্ষা

দেশকে বিদেশি শত্রুর হাত থেকে রক্ষা করার জন্য কাজ করে থাকে আমাদের প্রতিরক্ষা বাহিনী। প্রতিরক্ষা খাতে সরকার বিশেষ বরাদ্ধ দিয়ে থাকে প্রতি বছর। এই নিয়ে সুশীল সমাজের মধ্যে অসন্তুষ্টি রয়েছে। তবে এর হার এবার কমেছে। মোট বাজেটের ৬.৪% এবার এই খাতে বরাদ্ধ রয়েছে যা গত বছর ছিলো ৭.৩%।

কৃষি

ভর্তূকির দিক দিয়ে সবচেয়ে এগিয়ে আছে কৃষি খাত। এই ক্ষেত্রে মূলত সার, সেচের জন্য জ্বালানি খাতে সরকার ভর্তূকি দিয়ে থাকে। তবে বিশ্ব বাজারে জ্বালানি তেলের ক্রমাগত নিন্মমূখীর কারনে এই খাতে ভর্তূকির পরিমান এ বছর হ্রাস পেয়েছে।

অর্থমন্ত্রী বাজেট অধিবেশনে বলেছেন, ক্রমান্বয়ে কিছু কিছু ক্ষেত্রে ভর্তূকির পরিমান কমে আসবে।

মোট বাজেটের আকারের তুলনায় এবার এই খাতে বরাদ্ধের পরিমান হ্রাস পেয়েছে। ২০১০ সালে মোট বাজেটের ১০.৯% থাকলেও ২০১৮ সালে এসে তা নেমে দাড়ায় ৬.১%-এ।

সামাজিক নিরাপত্তা

এই খাতে এ বছর ৪৫,২৩০ কোটি টাকা বরাদ্ধ রাখা হয়েছে। এবং এর পরিমান আগামিতে আরো বাড়বে বলে বাজেটে ইঙ্গিত দিয়েছেন অর্থমন্ত্রী। তিনি আরও জানিয়েছেন, ব্যাক্তি পর্যায়ে এর আওতা এবং পরিধি দুইই বাড়বে।

এবার হাওর অঞ্চলের অবস্থা খুবই করুন ছিলো। তাই হাওর অঞ্চলের মানুষদের জন্য বিশেষ বরাদ্ধ রাখা হয়েছে বাজেটে। এছাড়া বয়স্ক ভাতা, দুস্থ ভাতা, শিক্ষা ভাতা, বেদে সম্প্রদায়ের জন্য ভাতা, চা শ্রমিকদের জন্য ভাতা, মাতৃত্বজনিত ভাতা, কর্মসংস্থান সৃষ্টি প্রকল্প, মুক্তিযুদ্ধা ভাতা, কাবিখা, একটি বাড়ি একটি খামার প্রকল্প এবং ওএমএস ইত্যাদি জনসহযোগিতামূলক কাজে বিশাল বরাদ্ধ রয়েছে এবারের বাজেটে।

জননিরাপত্তা

দেশের ভিতরে আইনশৃঙ্খলা রক্ষা করতে সরকার পুলিশ বাহিনী এবং আনসার বাহিনী এবং অন্যান্য নিরাপ্ততামূলক খাতে ব্যয় করে থাকে। এই খাতে গত বারের চেয়ে বরাদ্ধের হার এবার কমেছে। এই বছর মোট বাজেটের ৫.৭% এই খাতে বরাদ্ধ রাখা হয়েছে যা গত বছর ছিলো ৬.৫%।

জ্বালানি

২০১৩ সাল পর্যন্ত এই খাতে সবচেয়ে বেশি ভর্তূকি দিত সরকার। তখন আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বেশি ছিল বলে ভর্তূকি দিয়ে কম দামে বিক্রি করত। মূলত কৃষি কাজে সহায়তার জন্যই এই ভর্তূকি দেওয়া হতো।

কিন্তু বর্তমানে জ্বালানি তেলের দাম অনেক কমে যাওয়াতে এই খাতে সরকারেরভর্তূকির পরিমান কমেছে।

স্বাস্থ্য সেবা

আমাদের দেশের মানুষের অর্থনৈতিক অবস্থার কারনে বিশাল জনগোষ্টি সরকারি হাসপাতালগুলোর উপর নির্ভরশীল। বেসরকারি হাসপাতালগুলোতে লাগাম ছাড়া খরচের কারনে অনেকেই সেখানে যেতে না পেরে বাধ্য হয়ে সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা সেবা নিতে যান।

কিন্তু অব্যবস্থাপনা, অসহযোগিতাসহ বিভিন্ন ধরনের অভিযোগ রয়েছে সরকারি হাসপাতালগুলোর বিরুদ্ধে।

তার থেকে সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো আমাদের জেলা-উপজেলা সদরে হাসপাতালগুলোর শয্যা সংখ্যা খুবই সীমিত। প্রায়ই খবরে দেখা যায় হাসপাতালে আসন না পেয়ে মেঝেতে এমনকি বারন্দায়ও চিকিৎসা নিচ্ছেন রোগীরা।

শয্যা সংখ্যা বৃদ্ধি করা, প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি আনাসহ নানা দরকারি কাজে প্রচুর অর্থের দরকার। এই চিন্তা মাথায় রেখে সরকার প্রতি বছর এই খাতে বরাদ্ধ বাড়িয়ে যাচ্ছে।

এই বছর মোট বাজেটের ৫.২% এই খাতে বরাদ্ধ রাখা হয়েছে যা গত বছর ছিলো ৪.৭%।

এডিপি

আরেকটা বড় খাতে বাজেটের টাকা খরচ হয়ে থাকে তাহলো এডিপি। তবে এডিপি নিয়ে আমাদের অভিজ্ঞতা ভালো না। প্রতি বছরই বছরের প্রথম ছয়-নয় মাস তেমন কোন অগ্রগতিই হয় না। শেষ দিকে তাড়াহুড়ো করে খরচ করা হয়। যার দরুন কাজের মান ঠিক থাকেনা বলে অভিযোগ উঠে।এ নিয়ে আমাদের মিডিয়াতে কিছু রুটিন রিপোর্ট ছাপা হয় প্রতি বছর।

অনেক বড় বড় প্রকল্প সরকার হাতে নিয়েছে। যেমন পদ্মা সেতু, রূপপুর পারমানবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপন, মাতারবাড়ি ২ কয়লা বিদ্যুৎ কেন্দ্র প্রকল্প।। এই ধরনের আরো বড় যে প্রকল্পগুলো আছে তা যাতে সময়মতো শেষ হয় তার উপর গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে। এডিপি যাতে শতভাগ বাস্তবায়ন হয় সেজন্য মন্ত্রণালয় ভিত্তিক কাজের মূল্যায়ন চালু করা হয়েছে। তাই গত বছর অন্যান্য বছরের থেকে এডিপি বাস্তবায়ন অনেক বেশি হয়েছে।

সরকারের বাজেটের আকার প্রতি বছর লাফিয়ে লাফিয়ে বেড়ে যাচ্ছে। কিন্তু সেই টাকা আসছে করদাতাদের কাছ থেকে। আয়করদাতার সুযোগ সংকুচিত হচ্ছে।

এরপরেও আয়করদাতারা চান সরকার যেন তাদের কষ্টের টাকা দেশের সঠিক কাজে ব্যবহার করে। দেশ যেন ভালো একটা অবস্থানে পৌছাতে পারে। তাদের ভবিষত প্রজন্ম যেন সুখী একটা জীবন পায়। আপনার 2017-2018 ইনকাম ট্যাক্স রিটার্ন তৈরি করতে নিচের “SIGN UP” বাটন টি ক্লিক করুন|

Jasim Uddin Rasel
Facebook

Data Source: Bangladesh Ministry of Finance

 

By | 2017-09-11T14:44:29+00:00 September 11th, 2017|Income Tax|0 Comments

About the Author:

Leave A Comment

*

Shares