ট্যাক্স প্ল্যানিং: আপনার কষ্টার্জিত টাকা বাঁচানোর সহজ উপায়।

/, Income Tax, Income Tax Act 2023, Investment allowance, Tax Filing, Tax Rebate, Tax return/ট্যাক্স প্ল্যানিং: আপনার কষ্টার্জিত টাকা বাঁচানোর সহজ উপায়।

ট্যাক্স প্ল্যানিং: আপনার কষ্টার্জিত টাকা বাঁচানোর সহজ উপায়।

আমরা সবাই কষ্ট করি, টাকা রোজগার করি। কিন্তু সেই কষ্টার্জিত টাকার সঠিক ব্যবহারটা কি আমরা সবাই জানি? সৎ উত্তরটা সম্ভবত ‘না’। বছরের শেষে যখন আয়কর রিটার্ন জমা দেওয়ার সময় আসে, তখন অনেকেরই মাথায় হাত পড়ে। মনে হয়, এত টাকা আয়কর দিতে হলো , যদি কিছুটা হলেও বাঁচানো যেত!

কিন্তু ট্যাক্স প্ল্যানিং নামক ব্যাপারটা কি সত্যিই কঠিন? একদমই না। ব্যাপারটা অনেকটা নিজের বাগানের যত্ন নেওয়ার মতো। একটু সচেতন হলেই গাছগুলোতে ফুল ধরে, ফলের বাড় বাড়ে। ঠিক তেমনি, আপনার আয়ের গাছটাতেও একটু পরিচর্যা দরকার। আর এই পরিচর্যার নামই ট্যাক্স প্ল্যানিং। এর মানে এই না যে, সরকারকে ফাঁকি দেওয়া হবে। বরং সরকার আমাদের যে আইনি সুযোগগুলো দিয়েছে, সেগুলো কাজে লাগিয়ে নিজের ভবিষ্যৎকে সুরক্ষিত করাই হলো আসল কাজ।

ট্যাক্স প্ল্যানিং না করলে কী হয়?

ধরুন, আপনি সারা বছর খেটেখুটে একটি ভালো অঙ্কের টাকা আয় করলেন। কিন্তু হিসাব-নিকাশ না থাকায় বছরের শেষে দেখলেন, আপনার আয়ের একটা বড় অংশই চলে গেছে কর হিসেবে। ব্যাপারটা অনেকটা এই রকম যে, আপনি রোজগার করলেন, কিন্তু সেই টাকা আপনার কাজে লাগল না। তাই না?

ঠিক এই জায়গাতেই ট্যাক্স প্ল্যানিং কাজ করে। এটি আপনার আয়ের একটি অংশকে করের আওতার বাইরে রাখার আইনি পথ দেখায়। আর সেই টাকাটাই পরে আপনার স্বপ্নপূরণে, আপনার সন্তানের পড়াশোনায়, বা আপনার অবসর জীবনে কাজে লাগতে পারে।

আমার একজন বন্ধুর কথাই ধরুন। তার বেতন ভালোই, কিন্তু প্রতি বছর তাকে বিপুল পরিমাণ কর দিতে হতো। একবার বসে আমরা তার আয় আর খরচের একটা হিসাব বের করলাম। দেখা গেল, কিছু সাধারণ বিনিয়োগের মাধ্যমেই সে সহজেই করের বোঝা কমাতে পারে। সে সেই বছরই কিছু সঞ্চয়পত্র আর স্বাস্থ্যবিমা করল। পরের বছর তার কর কমে গেল অনেকটাই। সে নিজেই অবাক! সেই সামান্য পরিকল্পনাটাই তার হাজার হাজার টাকা বাঁচিয়ে দিল।

আপনার জীবনেই লাগাতে পারেন এই সহজ কৌশল
ট্যাক্স প্ল্যানিং কিন্তু কোনো দূরের বিষয় না। আপনি চাইলেই এটাকে আপনার জীবনের অংশ করে নিতে পারেন।

ছোট ছোট বিনিয়োগেই বড় পরিবর্তন: সরকার অনুমোদিত বিভিন্ন খাতে বিনিয়োগ করলে আপনি কর রেয়াত পান। যেমন, জীবন বীমা প্রিমিয়াম, ডিপোজিট পেনশন স্কিম (ডিপিএস), অনুমোদিত সঞ্চয়পত্র এবং অন্যান্য সরকারি সিকিউরিটিজ, ইউনিট সার্টিফিকেট/মিউচুয়াল ফান্ড/ইটিএফ/যৌথ বিনিয়োগ প্রকল্প, তালিকাভুক্ত স্টক বা শেয়ার, নির্ধারিত যাকাত তহবিল যাকাত প্রদান (যাকাত তহবিল ব্যবস্থাপনা আইন ২০২৩ এর অধীনে), সর্বজনীন পেনশন স্কিম ইত্যাদি।

আইন মেনেই সাশ্রয়: ট্যাক্স প্ল্যানিং মানে কিন্তু ট্যাক্স ফাঁকি দেওয়া না। এটি পুরোপুরি আইনি এবং দেশের নিয়মের মধ্যেই করা হয়। বরং এটি আপনাকে নিয়ম মেনে চলতে ও নির্ভয়ে রিটার্ন দাখিল করতে উৎসাহিত করে।

একটি শৃঙ্খলার জন্ম: যখন আপনি জানবেন যে বিনিয়োগ করলে কর কমবে, তখন আপনি স্বাভাবিকভাবেই সঞ্চয়ী ও বিনিয়োগমুখী হবেন। এই অভ্যাসটা কিন্তু সোনার হরিণের মতো। এটি আপনার অর্থকে শুধু বাঁচায়ই না, বাড়িয়েও তোলে।

একটু আগের কথায় ফিরে যাই। হিসাবটা কিন্তু খুব মজার। চলুন বিষয়টি দুটি উদাহরণ এর মাধ্যমে দেখা যাক।

উদাহরণ ১: যখন কোনো বিনিয়োগ নেই

ধরুন, আপনার মোট করযোগ্য আয় ১৩ লক্ষ টাকা। এই আয়ের উপর আপনার প্রদেয় আয়কর হতে পারে ১,১২,৫০০ টাকা। যদি আপনার উৎসে কর্তনকৃত আয়কর ২০,৪০০ টাকা হয় এবং আপনার কোনো বিনিয়োগ না থাকে, তাহলে আয়কর রিটার্ন দাখিলের সময় আপনাকে অতিরিক্ত (১,১২,৫০০ – ২০,৪০০) = ৯২,১০০ টাকা পরিশোধ করতে হবে।

উদাহরণ ২: যখন বিনিয়োগ রয়েছে

এখন ধরা যাক, আপনি ৩,০০,০০০ টাকা সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগ করেছেন। এক্ষেত্রে কর রেয়াতের পরিমাণ কিভাবে হিসাব করা হবে?

আইন অনুযায়ী, কর রেয়াত এই তিনটি মানের মধ্যে সর্বনিম্নটির উপর ভিত্তি করে নির্ধারিত হবে:

করযোগ্য আয়ের ৩%: (১৩,০০,০০০ × ৩%) = ৩৯,০০০ টাকা
মোট বিনিয়োগের ১৫%: (৩,০০,০০০ × ১৫%) = ৪৫,০০০ টাকা
সর্বোচ্চ সীমা: ১০,০০,০০০ টাকা

এই ক্ষেত্রে, সর্বনিম্ন পরিমাণ হলো ৩৯,০০০ টাকা। সুতরাং, আপনি ৩৯,০০০ টাকা কর রেয়াত পাবেন।

ফলে, আপনার পরিশোধযোগ্য আয়কর দাঁড়াবে: (১,১২,৫০০ – ৩৯,০০০ – ২০,৪০০) = ৫৩,১০০ টাকা।

লক্ষ্য করুন, কেবল ৩,০০,০০০ টাকা বিনিয়োগের মাধ্যমে আপনি প্রায় ৩৯,০০০ টাকা সাশ্রয় করতে পেরেছেন।

তাহলে বুঝতেই পারছেন, ট্যাক্স প্ল্যানিং শুধু একটি আর্থিক শব্দ নয়, এটি একটি জীবনদর্শন। এটি আপনাকে শেখায় কীভাবে নিজের ভবিষ্যতের জন্য আজই প্রস্তুতি নিতে হয়। শুধু তাই নয়, এটি আপনার দেশের প্রতিও দায়িত্বশীল হতে শেখায়, কারণ আপনি আপনার ন্যায্য করটুকু দিয়ে দেশ গঠনেও ভূমিকা রাখেন।

সুতরাং, আজ থেকেই একটু সময় বের করুন। আপনার আয়-ব্যয়ের হিসাব মেলান। দেখুন কোথায় কোথায় বিনিয়োগ করতে পারেন। আর যদি মনে হয় নিজে বুঝতে পারছেন না, তাহলে একজন অভিজ্ঞ ব্যক্তি বা কর উপদেষ্টার সাহায্য নিন। আর এর জন্য আপনি BDTax এর সাহায্য নিতে পারেন।

স্মার্টলি প্ল্যান করুন, আর নিশ্চিন্তে থাকুন। কারণ, আপনার ভবিষ্যৎ আপনারই হাতে।

 

খঃ হাসান আল মেহেদী (আয়কর আইনজীবী)

About the Author:

Leave A Comment

*

Shares
error: Content is protected !!